হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদে লাখ মুসল্লি জুমআর নামাজ আদায় করার সম্ভাবনা

হাসান মাহমুদ  ॥

মধ্যযুগে ধর্মীয় স্থাপত্য নিদর্শনগুলোর মধ্যে মুসলমানদের নির্মিত মসজিদগুলো ছিল অন্যতম। এমন একটি অনন্য মুসলিম স্থাপত্য নিদর্শন হলো চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ।

এটি চাঁদপুর জেলা সদর থেকে ২২ কি.মি পূর্বে হাজীগঞ্জ বাজারে অবস্থিত। বাংলা ১১৭৫ সাল থেকে ১২০০ সালের মধ্যে হজরত মকিমউদ্দিন (রহ.) ইসলাম ধর্ম প্রচারের উদ্দেশে আরব থেকে এ এলাকায় আগমন করেছিলেন।

তিনি স্ব-পরিবারে বর্তমান বড় মসজিদের মেহরাবসংলগ্ন স্থান, যেখানে একটু উঁচু ভূমি বিদ্যমান ছিল, সেখানে আস্তানা তৈরি করেন। একপর্যায়ে সেখানে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসতি স্থাপন করেন। মূলত এ এলাকায় হাজি মকিমউদ্দিন (রহ.) ইসলামধর্ম প্রচারের মাধ্যমে ইসলামের আবাদ করেন।

তারই বংশের শেষ পুরুষ হজরত মনিরুদ্দিন হাজি ওরফে মনাই হাজি (রহ.) দৌহিত্র আহমাদ আলী পাটওয়ারী (রহ.) বাংলা ১৩২৫ থেকে ১৩৩০ সালের দিকে বড় মসজিদের নির্মাণ শুরু করেন। প্রথমে মেহরাব বা তৎসংলগ্ন স্থান জুড়ে একচালা খড়ের ইবাদতখানা করেন। অতঃপর খড় ও গোলপাতা দিয়ে তৈরি দো-চালা মসজিদ নির্মাণ করেন। যা পরবর্তী সময়ে পাকা মসজিদ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।

১৩৩৭ বঙ্গাব্দের ১৭ আশ্বিন আহমাদ আলী পাটওয়ারীর (রহ.) ইচ্ছায় মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরীর (রহ.) হাতে পাকা মসজিদের ভিত্তিস্থাপন করা হয়।

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদ এ অঞ্চলের অন্যতম মুসলিম নিদর্শন হিসেবে পরিচিত। মসজিদটি নির্মাণকালে স্থাপত্যশিল্পের যে নির্মাণশৈলী দেওয়া হয়েছে, তা যেন স্থাপত্যশিল্পেরই বিশুদ্ধ ব্যাকরণ। মসজিদের বিভিন্ন অংশে যে কারুকাজ ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, তা কালের সাক্ষ্য বহন করছে।

ঐতিহ্যবাহী এই মসজিদ তিন অংশে নির্মিত হয়েছে। প্রথম অংশ চার হাজার ৭৮৪ বর্গফুট। মাঝের অংশ ১৩ হাজার ছয় বর্গফুট এবং তৃতীয় অংশে এক হাজার ৬১৫ বর্গফুট। সর্বমোট ২৮ হাজার ৪০৫ বর্গফুট আয়তনের।

ওই মসজিদের প্রথম অংশে হজরত মাওলানা আবুল ফারাহ জৈনপুরী (রহ.) মাচার ওপর বসেন। তাঁর পবিত্র হাতে চুন-সুরকির মসলা কেটে কেটে মেহরাবসংলগ্ন দেয়াল ঘুরিয়ে মসজিদের প্রথম অংশের ওপরের দিকে ‘সুরা ইয়াছিন’ ও ‘সুরা জুমআ’ লিপিবদ্ধ করেন।

মসজিদের অনন্য সুন্দর মেহরাবটি কাচের ঝাড়ের টুকরো নিখুঁতভাবে কেটে কেটে মনোরম ফুলের ঝাড়ের মতো আকর্ষণীয় নকশায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে। মাঝের অংশটি ৭৭টি আকর্ষণীয় পিলার ও ঝিনুকের মোজাইক দিয়ে নির্মিত হয়েছিল।

তৃতীয় অংশটিতে রয়েছে তিনটি বিশাল গম্বুজসহ আকর্ষণীয় বিশাল সুউচ্চ মিনার। যা মসজিদটিকে আলাদা বিশেষত্ব দান করেছে। ১৯৫৩ সালে ১২৮ ফুট উঁচু এই মিনারটি তৈরি হয়েছিল। সুউচ্চ এই মিনারটিরও আলাদা একটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। আর তা হলো মসজিদের প্রধান প্রবেশদ্বারের ওপর এত উঁচু মিনারের উপস্থিতি সেকালের নির্মাণ বিষয়টিকে ভাবিয়ে তোলে। মিনারের উঁচু প্ল্যাটফর্মে বহু মুসুল্লি ও পর্যটক উঠে হাজীগঞ্জের চারপাশের দৃশ্য অবলোকন করেন।

রমজানের শুরুতে প্রতিদিনই হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদে তারাবি পড়ার জন্য দূরদুরান্ত থেকে হাজার হাজার হাফেজ ও আলেম ছুটে আসে।

প্রতি শুক্রবার লক্ষ লক্ষ মানুষ বিভিন্ন জেলা উপজেলা থেকে নামাজ পড়তে আসে হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদে। মসজিদের আশে পাশের ভবন সম্পূর্ণ পরিপূর্ণ হয়ে চাঁদপুর-কুমিল্লা আঞ্চলিক মহাসড়কে নামাজ পড়ে ধর্মপ্রাণ মুসল্লিরা।

হাজীগঞ্জ ঐতিহাসিক বড় মসজিদের মোতাওয়ালি প্রিন্স শাকিল আহমেদ প্রতিদিনই মুসল্লিদের নামাজের ব্যবস্থাপনাসহ শুক্রবার বিশাল জুময়ার জামায়াতের তদারকি করে থাকেন।

এ মসজিদের মতোআল্লি বলেন, আমার আগে আমার শ্রদ্ধেয় আব্বাজান মতোআল্লির দায়িত্বে ছিলেন। তাঁর হাতে মসজিদে পরিচালনার জন্য আয়বর্ধক বেশ কিছু মার্কেট করে গেছেন। যার আয় এবং মুসল্লিদের দানের টাকায় সুন্দর ভাবে মসজিদ পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে মসজিদে চারজন এতেকাফরত রয়েছে। এদের খাবার-দাবারও মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে বহন করা হয়।

Loading

শেয়ার করুন: