পিলখানা হত্যাকাণ্ডের মূল উদ্দেশ্য ছিল সামরিক বাহিনীকে আঘাত করা: চিফ প্রসিকিউটর (বিজিবি) মো. বোরহান উদ্দিন

 

ফারুক হোসেন ॥

পিলখানা হত্যাকাণ্ড ছিলো বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর কাঠামোকে ধ্বংস করার গভীর ষড়যন্ত্র, এমন মন্তব্য করেছেন চিফ প্রসিকিউটর (বিজিবি) ও অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল আলহাজ্ব অ্যাডভোকেট মো. বোরহান উদ্দিন।

শুক্রবার রাতে চাঁদপুরের মতলব উত্তর উপজেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ফারুক হোসেনের বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি বলেন, পিলখানার বিষয়টা ১৭ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে দুঃখজনক ও ন্যাক্কারজনক ট্র্যাজেডি হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এই বিদ্রোহে আমাদের চৌকস ৫৭ জন সেনা কর্মকর্তা ও আরও ১৭ জনসহ মোট ৭৪ জন মানুষ নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছেন।

তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে ঢাল-ভাত কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে বিদ্রোহ উসকে দেওয়া হলেও সাক্ষ্যপ্রমাণ বলছে—এই বিদ্রোহ ছিল সুপরিকল্পিত। সামরিক বাহিনীর শৃঙ্খলা ও কাঠামো ভেঙে ফেলার জন্যই এটি করা হয়েছিল।

এ প্রসঙ্গে তিনি আরও জানান, সেনা হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য ছিল দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় মারাত্মক বিপর্যয় ঘটানো, সামরিক বাহিনীর নেতৃত্ব কাঠামো দুর্বল করে ফেলা এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা।

বিদ্রোহের নেপথ্যে রাজনৈতিক প্রভাবের ইঙ্গিত দিয়ে বোরহান উদ্দিন বলেন, সাক্ষ্য-প্রমাণে উঠে এসেছে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন, ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস, জাহাঙ্গীর কবির নানক, মির্জা আজমসহ একাধিক নেতার অংশগ্রহণে একটি সমন্বয় সভা (পড়হংঢ়রৎধপু সববঃরহম) অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সিদ্ধান্ত হয়, বিডিআরের মহাপরিচালকের (ডিজি) পদে সেনা কর্মকর্তাদের না রেখে রাজনৈতিকভাবে বিশ্বস্ত কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হবে। এমনকি ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপসকে ডিজি বিডিআর করার পরিকল্পনাও ছিল।

তিনি বলেন, বিডিআরের নিজস্ব কোনো কর্মকর্তা না থাকায় সেনা কর্মকর্তারা ডেপুটেশনে এসে দায়িত্ব পালন করতেন। সেই কাঠামো নিয়েই অসন্তোষ ও বিদ্বেষ উসকে দেওয়া হয়েছিল। সেনা কর্মকর্তারা নাকি সুযোগ-সুবিধা আত্মসাৎ করছে, এমন ভুল তথ্য ছড়িয়ে বিদ্রোহে প্ররোচিত করা হয়েছিল।

মামলার অগ্রগতি বিষয়ে তিনি জানান, বিদ্রোহ সংক্রান্ত মামলা দুই ভাগে বিভক্ত, হত্যা মামলা ও বিস্ফোরক আইনে মামলা। হত্যার মামলার রায় হয়ে গেছে, যেখানে বহুজনকে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়েছে এবং কিছু খালাসও হয়েছে। খালাস পাওয়া আসামিদের মধ্যে অনেকে হাইকোর্টে যাবজ্জীবন সাজা পেয়েছেন। বর্তমানে কিছু আপিল সুপ্রিম কোর্টে বিচারাধীন।

বিস্ফোরক আইনের মামলা এখনো বিচারাধীন জানিয়ে তিনি বলেন, ৩, ৪ ও ৬ ধারায় চার্জশিট গঠন করা হয়েছে। ২৮৮ জন সাক্ষীর জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়েছে।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, আমরা পক্ষপাতদুষ্টভাবে কাউকে আসামি বানাচ্ছি না, আবার প্রকৃত অপরাধীদের ছাড়ও দেওয়া হচ্ছে না। ইতিমধ্যে ২১৮ জন আসামি জামিন পেয়েছেন। বিচারক স্বাধীনভাবে সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
বিদ্রোহের আন্তর্জাতিক প্রভাব উল্লেখ করে তিনি জানান, রৈমারী সীমান্তে ভারতীয় সেনা সদস্যদের বেআইনি অনুপ্রবেশ ও মৃত্যু ঘিরে, এই বিদ্রোহ কোনো প্রতিশোধমূলক ঘটনার অংশ ছিল কিনা—তা নিয়েও বিভিন্ন সাক্ষ্যে ইঙ্গিত মিলেছে।
তিনি বলেন, জাতি তাদের হারানো সেনা কর্মকর্তাদের জন্য ন্যায়বিচার চায়। তাদের পরিবার আজও শোকবিহ্বল। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে আমরা আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছি, যেন সত্যিকারের অপরাধীরা বিচারের আওতায় আসে।

মতবিনিময় সভায় উপস্থিত ছিলেন, মতলব উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি এসএম জাহাঙ্গীর আলম প্রধান, ছেংগারচর পৌর বিএনপির সভাপতি নান্নু মিয়া প্রধান, সহ-সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম মোল্লা, যুবদলের নেতা নুমান, ছাত্র বিষয়ক সম্পাদক সাদ্দাম হোসেন’সহ বিভিন্ন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও স্থানীয় সাংবাদিকবৃন্দ।

Loading

শেয়ার করুন: