চাঁদপুরে সফল অস্ত্রোপচার, বের হলো ৬.৪৫ কেজির টিউমার

 


প্রতিনিধি :

পেটটা দিন দিন ফুলে উঠছিল। খাওয়ার রুচি কমে গিয়েছিল, খাবার খেলেই অস্বস্তি। বয়স ৬৫ বছর-তাই প্রথমে খুব একটা গুরুত্ব দেননি মিলন বেগম। কিন্তু সময়ের সঙ্গে পেটের আকার অস্বাভাবিকভাবে বাড়তে থাকায় উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন পাঁচ সন্তানের এই মা। এক চিকিৎসকের পরামর্শ থেকে আরেক চিকিৎসকের কাছে ছুটেছেন, করিয়েছেন নানা পরীক্ষা। অবশেষে জানা গেল, তাঁর পেটে বাসা বেঁধেছে বিশাল আকৃতির একটি টিউমার।

চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, টিউমারটির আকার এতটাই বড় ছিল যে অস্ত্রোপচারটি ছিল জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ। আশঙ্কা ছিল, এটি আশপাশের রক্তনালি, কিডনি, অন্ত্রসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের সঙ্গে লেগে থাকতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে নানা ঝুঁকি মাথায় নিয়েই অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা।

শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই ঘণ্টার অস্ত্রোপচারে মিলন বেগমের পেট থেকে অপসারণ করা হয়েছে ফুটবল আকৃতির ৬ কেজি ৪৫০ গ্রাম ওজনের টিউমার। চাঁদপুর শহরের মেরিন হাসপাতালে শুক্রবার (৭ আগস্ট) সন্ধ্যায় অস্ত্রোপচারটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। বর্তমানে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে থাকা মিলন বেগমের শারীরিক অবস্থা স্থিতিশীল।

চাঁদপুর পৌরসভার শিলন্দিয়া এলাকার কাজীবাড়ির বাসিন্দা মিলন বেগমের স্বজনেরা জানান, কয়েক মাস আগে তাঁর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলতে শুরু করে। সঙ্গে ছিল খেতে না পারা ও পেটে অস্বস্তি। প্রথমে স্থানীয়ভাবে কয়েকজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেন তিনি।

পরে মেরিন হাসপাতালে থাইরয়েড, হরমোন ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডা. মাহমুদুল হাসানের পরামর্শ নেন। তাঁর পরামর্শে আলট্রাসনোগ্রাম করানো হলে পেটে বড় আকৃতির একটি ওভারিয়ান সিস্ট/টিউমারের উপস্থিতি ধরা পড়ে।

টিউমারটির আকার অস্বাভাবিক বড় হওয়ায় পরবর্তী সময়ে ইবনে সিনা মেডিকেল সেন্টারে সিটি স্ক্যান করানো হয়। প্রতিবেদনে টিউমারটির আনুমানিক ওজন প্রায় সাড়ে পাঁচ কেজি উল্লেখ করা হয়।

এরপর রোগীকে সার্জারি বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিতে বলেন ডা. মাহমুদুল হাসান। স্বজনেরা তাঁকে কুমিল্লার একজন গাইনি অধ্যাপক ও বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে যান। সেখানেও অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে টিউমারটি বড় হওয়ায় অস্ত্রোপচারটি ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে বলে জানানো হয়। পাশাপাশি সম্ভাব্য চিকিৎসা ব্যয় নিয়েও পরিবারের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।

পরে আবার চাঁদপুরের মেরিন হাসপাতালে ফিরে আসেন মিলন বেগম। জুলাই মাসের শেষ বৃহস্পতিবার সেখানে সার্জন ও সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হাসান ইমাম সানীর পরামর্শ নেন তিনি।

রোগীর সিটি স্ক্যানসহ সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রতিবেদন এবং শারীরিক অবস্থা পর্যালোচনা করে অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নেন ডা. সানী। এ জন্য গঠন করা হয় একটি চিকিৎসক দল।

শুক্রবার সন্ধ্যায় শুরু হয় অস্ত্রোপচার। প্রায় দুই ঘণ্টা পর চিকিৎসকেরা সফলভাবে পেট থেকে বের করে আনেন বিশাল আকৃতির টিউমারটি। পরে ওজন করে দেখা যায়, সেটির ওজন ৬ কেজি ৪৫০ গ্রাম।

অস্ত্রোপচারের পর চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রয়েছেন মিলন বেগম। হাসপাতাল সূত্র জানিয়েছে, তাঁর শারীরিক অবস্থা বর্তমানে স্থিতিশীল।

অস্ত্রোপচারের নেতৃত্ব দেওয়া সেন্ট্রাল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান, সার্জন ও সহকারী অধ্যাপক ডা. এইচ এম হাসান ইমাম সানী বলেন, এত বড় আকারের টিউমার আসলে বিরল। রোগী একজন বয়স্ক মা। তিনি অনেক কষ্ট পাচ্ছিলেন। মানবিক দিক বিবেচনা করেই আমরা অস্ত্রোপচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।

তিনি বলেন, এ ধরনের বড় টিউমার অপসারণে ঝুঁকি থাকে। তবে চিকিৎসক দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে।

জেনারেল সার্জন ও ল্যাপারোস্কপিক কনসালটেন্ট ডা. মো. হাসান জুলকার নাইন বলেন, অপারেশনের আগে আমাদের অনেক কিছু বিবেচনা করতে হয়েছে। টিউমারটি অতিরিক্ত বড় হওয়ায় আশপাশের রক্তনালি, কিডনি, অন্ত্র কিংবা অন্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গের ওপর চাপ সৃষ্টি অথবা সেগুলোর সঙ্গে লেগে থাকার আশঙ্কা ছিল। ফলে নানা চ্যালেঞ্জ ছিল। আলহামদুলিল্লাহ, সফলভাবে অস্ত্রোপচার হয়েছে। রোগী ভালো আছেন।

অস্ত্রোপচার টিমে আরও ছিলেন অ্যানেসথেশিয়া কনসালটেন্ট ডা. আরিফুর রহমান কিরণ, মেডিসিন, ডায়াবেটিস ও থাইরয়েড বিশেষজ্ঞ ডা. সাইফ জামান এবং মেরিন হাসপাতালের মেডিকেল অফিসার ডা. মনিষা জামান মীমসহ সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা।

মেরিন হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জিহাদুল ইসলাম বলেন, আমাদের হাসপাতাল নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে। আমরা শুধু ব্যবসার কথা না ভেবে সেবার মনোভাব নিয়ে কাজ করতে চাই।

তিনি বলেন, এত বড় একটি অস্ত্রোপচার চাঁদপুরে না করার পরামর্শ অনেকেই দিয়েছিলেন। কিন্তু রোগীর স্বজনেরা চাঁদপুরেই আমাদের হাসপাতালে অস্ত্রোপচার করানোর বিষয়ে অনড় ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সফলভাবে অস্ত্রোপচার সম্পন্ন হয়েছে। এ ধরনের একটি জটিল অস্ত্রোপচার সম্পন্ন করার জন্য চিকিৎসকদের প্রতি আমরা কৃতজ্ঞ।

Loading

শেয়ার করুন: