রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টিতে চাঁদপুরে ভয়াবহ জলাবদ্ধতা

 

 

সাইম পাটওয়ারী :

টানা তিন ঘণ্টার মুষলধারে বৃষ্টিতে চাঁদপুর শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। সোমবার (২০ জুলাই) দুপুর ১২টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ৯০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে চাঁদপুর আবহাওয়া অফিস।

অল্প সময়ের এই ভারী বর্ষণে শহরের নিচু এলাকা, অলিগলি এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক পানিতে তলিয়ে যায়। ফলে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হয় এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

সকালের দিকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম থাকলেও দুপুরের পর হঠাৎ করেই ভারী বর্ষণ শুরু হয়। কয়েক ঘণ্টার টানা বৃষ্টিতে শহরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটুসমান পানি জমে যায়। জলাবদ্ধতার মধ্যেই রিকশা, অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশাগুলোকে ঝুঁকি নিয়ে যাত্রী পরিবহন করতে দেখা যায়। জরুরি প্রয়োজনে অনেকেই ছাতা ও রেইনকোট পরে পানির মধ্য দিয়েই গন্তব্যে যেতে বাধ্য হন।

সবচেয়ে বেশি জলাবদ্ধতা দেখা যায়, শহরের বিষ্ণুদী মাদ্রাসা রোড, প্রফেসরপাড়া, রহমতপুর কলোনি, চেয়ারম্যানঘাট, ব্যাংক কলোনি, নাজিরপাড়া, বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়, বাবুরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়,৩ নং কল্যাণপুর ইউনিয়ন পরিষদ, মডেল টাউন ও আশপাশের বিভিন্ন সড়ক বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন স্থানীয় বাসিন্দা, শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও পথচারীরা।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনের সড়কে হাঁটুসমান পানি জমে রয়েছে। বিদ্যালয় থেকে শুরু করে মডেল টাউন ও আশপাশের এলাকার অধিকাংশ সড়ক পানির নিচে থাকায় যানবাহন চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। প্রতিদিন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।

স্থানীয়রা জানান, সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্ত থাকলেও জলাবদ্ধতার কারণে সেগুলো দেখা যায় না। ফলে অটোরিকশা, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন যানবাহন গর্তে পড়ে দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। এছাড়া রাস্তার পাশের অনেক ড্রেনে স্ল্যাব (ঢাকনা) না থাকায় অসাবধানতাবশত পথচারীরা ড্রেনে পড়ে আহত হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। বিশেষ করে রাতে ও বৃষ্টির সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি কয়েকগুণ বেড়ে যায়।

অটোরিকশা চালকরা জানান, পানি জমে থাকার কারণে কোথায় রাস্তা আর কোথায় গর্ত তা বোঝা যায় না। অনেক সময় যাত্রী নিয়ে চলাচলের সময় গাড়ি হেলে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এতে যাত্রী ও চালক উভয়েই ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
জলাবদ্ধতার কারণে বাবুরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, চাঁদপুর সদর উপজেলার কল্যাণপুর ইউনিয়ন পরিষদ কার্যালয়ের সামনের সড়ক এবং আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘ সময় ধরে পানি জমে থাকছে। এতে বিদ্যালয়ে আসা শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে।

বাবুরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তপন কুমার রায় বলেন, ক্লাব মার্কেটের পেছনের ড্রেনের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ভেঙে পড়ে আছে। ফলে বৃষ্টির পানি স্বাভাবিকভাবে নিষ্কাশন হতে পারে না। এ কারণে বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা এবং স্কুলের ভেতর পানি আটকে যায়। এতে শিক্ষার্থীদের পাঠদান ব্যাহত হয় এবং ছোট ছোট শিশুদের বিদ্যালয়ে আসতে অনেক কষ্ট হয়। আমি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অনুরোধ জানাচ্ছি, বিদ্যালয়ের মাঠে অন্তত দুই ফুট মাটি ভরাট করা হলে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে এবং শিক্ষার্থীরা নিরাপদে বিদ্যালয়ে যাতায়াত করতে পারবে।

স্থানীয় বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, সামান্য বৃষ্টি হলেই ১৪ নং ওয়ার্ডের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সামনের রাস্তা পানিতে তলিয়ে যায়। কারণ স্কুলের সামনে ড্রেনের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরে ভাঙা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। পানি বের হতে না পারায় পুরো এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যাটি থাকলেও পৌরসভার পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো সংস্কার উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

এলাকার আরও কয়েকজন বাসিন্দা জানান, ড্রেনগুলো দীর্ঘদিন পরিষ্কার না করায় এবং বাবুরহাট উচ্চ বিদ্যালয়ের সামনে ও ক্লাব মার্কেটের পেছনের ড্রেন ভেঙে যাওয়ায় পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ব্যাহত হয়েছে। প্রায় দুই বছর ধরে সমস্যাটি বিদ্যমান থাকলেও স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ফলে প্রতি বর্ষা মৌসুমেই সামান্য বৃষ্টিতেই পুরো এলাকা জলাবদ্ধতায় ডুবে যায়।

স্থানীয়দের অভিযোগ, জলাবদ্ধতার কারণে শুধু মানুষের চলাচলই ব্যাহত হচ্ছে না, ব্যবসা-বাণিজ্যেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। অনেক দোকানে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এছাড়া দীর্ঘসময় পানি জমে থাকায় পরিবেশ দূষণ, মশার উপদ্রব এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকিও বাড়ছে।

এলাকাবাসীর দাবি, দ্রুত ভাঙা ড্রেন সংস্কার, ড্রেন পরিষ্কার, পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে ড্রেনের স্ল্যাব নির্মাণ করা হোক। একই সঙ্গে বাবুরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মাঠ উঁচু করার উদ্যোগ নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে স্থানীয়রা সংশ্লিষ্ট পৌর কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের আশা, দ্রুত প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতার সমস্যা থেকে মুক্তি পাবে বাবুরহাট এলাকার হাজারো মানুষ।

চাঁদপুর আবহাওয়া অফিসের উচ্চ পর্যবেক্ষক শাহ মো. শোয়েব বলেন, দুপুরের দিকে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ হঠাৎ বেড়ে যায়। আগামী দুই থেকে তিন দিন থেমে থেমে বৃষ্টি হতে পারে এবং আবহাওয়া একই ধরনের থাকতে পারে।

Loading

শেয়ার করুন: