ডিপিএস গ্রাহকদের নামে জালিয়াতি ঋণ,  জেল -জুলুমে বাড়ী ছাড়া হাইমচরের অর্ধশত পরিবার

 

 

নিজস্ব প্রতিনিধি :

নিরীহ ডিপিএস গ্রাহকদের তথ্য জালিয়াতি করে প্রতারণামূলক ঋণ প্রদান, অর্থ আত্মসাৎ ও আইনি হয়রানির অভিযোগে চাঁদপুরে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। এ ঘটনায় শনিবার দুপুরে ভুক্তভোগীরা চাঁদপুর প্রেস ক্লাব-এ আয়োজিত এক সাংবাদিক সম্মেলনে বিস্তারিত অভিযোগ তুলে ধরেন।

সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগীরা জানান, চাঁদপুরের হাইমচর উপজেলার দক্ষিণ আলগী ইউনিয়নের চরভাঙ্গা গ্রামের তাজুল ইসলাম কবিরাজ, তার স্বজন আছমা আক্তার ও মোঃ আলাউদ্দিন কবিরাজের নিয়ন্ত্রণাধীন ইসলামি ব্যাংকের একটি এজেন্ট ব্যাংক শাখার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে এই প্রতারণা চালানো হয়।

ডিপিএস হিসাব খোলার প্রলোভন দেখিয়ে স্থানীয় অন্তত ৫০ জনের কাছ থেকে জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি, টিপসই ও স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়। এরপরই শুরু প্রতারণা। ইসলামি ব্যাংক চাঁদপুর এবং ফরিদগঞ্জ শাখা থেকে ৪০ জন গ্রাহকের নামে নেয়া হয় প্রায় দুই কোটি টাকা।

ভুক্তভোগী নূর ই আলম বলেন, ইসলামী ব্যাংক,চাঁদপুর শাখার তৎকালীন কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম তার শালিকা আসমা আক্তারের নামে হাইমচরে ওই ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিং শাখা। সেই শাখাটি মূলত পরিচালনা করতেন তিনি নিজে এবং তার ভাই আলাউদ্দিন কবিরাজ। এরা দুজনই অপরাধের মূল নায়ক।

সংবাদ সম্মেলনে তাদের অভিযোগ, তৎকালীন ইসলামী ব্যাংক কর্মকর্তা তাজুল ইসলাম কবিরাজ, তার ভাই আলাউদ্দিন কবিরাজ, ইসলামি ব্যংক কর্মকর্তা আজাদ,কবির হোসেন, ওমর আইয়ুব, নূর ই আলম এবং আশরাফুজ্জামান এসব প্রতারণার মূল হোতা।
ভুক্তভোগী কাদের সরদার হাইমচর ইউনিয়েেন সাহেবগঞ্জ এলাকার বাসিন্দা। পেশায় ট্রলার চালক। তিনি বলেন, গত ৩ মাস আগে জানতে পারি আমার নামে ব্যাংক লোন রয়েছে। এ কাজে আমার অগোচরে ডিপিএস এর নাম করে এনআইডি কাড ব্যবহার করা হলেও আমি বিষয়টি সম্পর্কে অবগত না।

এলাকার বাসিন্দা ও চাঁদপুর ইসলামি ব্যাংকের জনৈক কর্মকর্তা তাজউদ্দীন কবিরাজ আমাকে ফাঁসিয়েছে। সে আমার নামে ব্যাংকে ভুয়া কাগজ তৈরি করে ৩ লাখ টাকা লোন নেয়। যা বর্তমানে সুদেআসলে ৩ লাখ ৪১ হাজার ৬শ’ টাকা হয়েছে। এ ঘটনায় ব্যাংক কর্তৃপক্ষের দায়েরকৃত মামলায় আমি এখন পলাতক আসামি।

একই অভিযোগ করেন শাহজালাল সরকার, সোহেল রাণা, আমানউল্লাহ সর্দার,বারেক সর্দার এবং শাহজালাল সর্দার। এরা সবাই হাইমচর উপজেলার নীলকমল ইউনিয়নের মধ্যচর এলাকায়।

শাহজালাল জানান, ডিপিএস এর নাম করে তার কাছ থেকে এনআইডি কার্ডের ফটোকপি নেয়া হয়। তার নামে নেয়া লোন এখন সুদেআসলে ২ লাখ ৮৬ হাজার টাকা হয়েছে।

তিনি বলেন, আমার নিরীহ লোক। কৃষি কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করি। আমি এ ঘটনায় সুষ্ঠু তদন্ত দাবি ও দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধ আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানাচ্ছি।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, এসব তথ্য ব্যবহার করে তাদের অজ্ঞাতে একাধিক ব্যাংক হিসাব খোলা হয়, চেকবই ইস্যু করা হয় এবং পরবর্তীতে তাদের নামে ঋণ অনুমোদন করা হয়। কিন্তু ওই ঋণের অর্থ গ্রাহকদের হাতে না দিয়ে সংশ্লিষ্টরা নিজেরাই আত্মসাৎ করেন। পুরো প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশ ছিল বলেও অভিযোগ করা হয়।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো—ঋণ পরিশোধ না হওয়ার অজুহাতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করে। অথচ তারা কেউই ঋণ গ্রহণের বিষয়ে অবগত ছিলেন না। মামলার বিষয়ে কোনো নোটিশ না পেয়েই অনেকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয় এবং কয়েকজনকে কারাভোগ করতে হয়। পরে তারা বাধ্য হয়ে ঋণের আংশিক অর্থ আদালতে জমা দিয়ে জামিনে মুক্তি পান।

সংবাদ সম্মেলনে আরও বলা হয়, মামলার পুরো প্রক্রিয়ায় ভুক্তভোগীদের অজ্ঞাতে ভুয়া তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে এবং আদালতেও বিভ্রান্তিকর তথ্য দেওয়া হয়েছে। এতে বিচার প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ভুক্তভোগীদের দাবি, চেক সংক্রান্ত মামলার ক্ষেত্রে আইনি নোটিশ প্রদান বাধ্যতামূলক হলেও তারা কেউই এমন কোনো নোটিশ পাননি। এছাড়া ঋণের অর্থ গ্রহণ না করায় তাদের বিরুদ্ধে দায় আরোপ আইনগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় বলেও তারা দাবি করেন।

অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, একই কৌশলে অন্য শাখাতেও অনুরূপ প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে। এতে সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে চরম আতঙ্ক ও অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে ভুক্তভোগীরা দ্রুত একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, জড়িতদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান এবং ক্ষতিগ্রস্তদের অর্থ ফেরত ও ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট এজেন্ট ব্যাংক শাখার বিরুদ্ধে কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।

সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট এর অ্যাড, ব্যারিস্টার হামিদুল মিসয়াহ বলেন, নিরীহ গ্রাহকদের তথ্য ব্যবহার করে এ ধরনের প্রতারণা শুধু আর্থিক অপরাধ নয়, এটি মানুষের জীবনে মারাত্মক দুর্ভোগ ডেকে এনেছে। অনেকেই বিনা অপরাধে কারাভোগ করেছেন, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত পদক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগীরা।

Loading

শেয়ার করুন: