উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্যে লোকসানে হাইমচরের পানচাষিরা

 

হাইমচর প্রতিনিধি :

হাইমচরে পান চাষের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি ও মধ্যস্বত্বভোগীদের কারণে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না পানচাষিরা। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধিতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। অন্যদিকে পাইকারি ও খুচরা বাজারে পানের দামের বড় ব্যবধান থাকায় লাভের পরিবর্তে লোকসান গুনতে হচ্ছে অনেক কৃষককে।

মেঘনাপাড়ের কৃষিপ্রধান উপজেলা হাইমচরের ছয়টি ইউনিয়নের মধ্যে অধিকাংশ এলাকায় পান চাষ হয়ে থাকে। চলতি মৌসুমে উপজেলায় ২৩৫ হেক্টর জমিতে ২৭২টি পানের বরজ গড়ে উঠেছে। এ পেশার সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত রয়েছেন প্রায় ছয় হাজার কৃষক। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, প্রতিবছর এ উপজেলায় ৫০ থেকে ৫২ কোটি টাকার পান বিক্রি হয়।

সম্প্রতি উপজেলার উত্তর ও দক্ষিণ আলগী ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পানচাষি ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বছরের অধিকাংশ সময় পান উৎপাদন স্বাভাবিক থাকলেও মৌসুমভেদে নানা সংকটে পড়তে হয় কৃষকদের। বিশেষ করে বৈশাখ থেকে আশ্বিন মাস পর্যন্ত পানের উৎপাদন ভালো হলেও এ সময়ে বাজারে দাম তুলনামূলক কম থাকে। বরিশাল, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে পান আমদানি হওয়ায় স্থানীয় উৎপাদিত পান কম দামে বিক্রি করতে বাধ্য হন চাষিরা। আবার শীত মৌসুমে উৎপাদন কমে যাওয়ার পাশাপাশি রোগবালাইয়ের প্রকোপ বাড়ে।

উত্তর আলগী ইউনিয়নের মহজমপুর গ্রামের উপজেলা সদর সড়কে রয়েছে হাইমচরের অন্যতম বড় পানের পাইকারি বাজার। প্রতি মঙ্গলবার এখানে সাপ্তাহিক হাট বসে। এর আগে চাষিরা নিজেদের বরজ থেকে পান সংগ্রহ করে সাজিয়ে বিক্রির জন্য প্রস্তুত করেন। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে পাইকার ও খুচরা ব্যবসায়ীরা এসে এখান থেকে পান কিনে নিয়ে যান।

মহজমপুর গ্রামের পানচাষি সিরাজুল ইসলামের ৪০ শতাংশ জমিতে পানের বরজ রয়েছে। তিনি জানান, ২০২৪ সালে অতিবৃষ্টিতে তাঁর বরজ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে নতুন করে বিনিয়োগ করে বরজ গড়ে তুললেও সেই ক্ষতির ধকল এখনো কাটিয়ে উঠতে পারেননি। পানের ভালো দাম পেলে আগের লোকসানের কিছুটা পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা তাঁর।

একই এলাকার চাষি সামছুদ্দিন বলেন, বৈশাখ থেকে আশ্বিন পর্যন্ত পানের উৎপাদন ভালো হয়। কিন্তু এ সময় বাজারে দাম কম থাকায় কাঙ্ক্ষিত আয় পাওয়া যায় না। আবার শীতকালে উৎপাদন কমে যায় এবং রোগবালাই বেড়ে যায়। ফলে সারা বছরই কোনো না কোনো সংকট মোকাবিলা করতে হচ্ছে তাঁদের।

দক্ষিণ মহজমপুর গ্রামের পানচাষি আব্দুর রহমান বলেন, পাইকারি বাজারে প্রতি বিড়া পান ৪০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। অথচ একই পান খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১২০ থেকে ১৫০ টাকায়। উৎপাদক ও ভোক্তার মাঝখানে একাধিকবার হাতবদল হওয়ার কারণে দামের এত বড় ব্যবধান তৈরি হচ্ছে। এর সুবিধা ভোগ করছেন মধ্যস্বত্বভোগীরা। অথচ পান উৎপাদনের মূল পরিশ্রম ও ঝুঁকি নিতে হচ্ছে কৃষকদের।
একই এলাকার চাষি সোলাইমান বলেন, দিন দিন পান উৎপাদনের খরচ বাড়ছে। কীটনাশকের দাম বেড়েছে, প্রতি কেজি সার কিনতে হচ্ছে ৫০ টাকা দরে। অন্যদিকে একজন শ্রমিকের দৈনিক মজুরি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। বরজের পরিচর্যা ও পান সংগ্রহে শ্রমিক নিয়োগ করতে গিয়ে উৎপাদন ব্যয় অনেক বেড়ে যাচ্ছে। পূর্বপুরুষদের পেশা ধরে রাখতেই তাঁরা পান চাষ করছেন। কিন্তু বাড়তি খরচের তুলনায় বিক্রিমূল্য কম হওয়ায় লোকসান গুনতে হচ্ছে।

শ্রমিকের উচ্চ মজুরির কারণে অনেক চাষি এখন নিজেরাই বরজের পরিচর্যা ও পান সংগ্রহের কাজ করছেন। হাটের আগের দিন পান সংগ্রহ করে সাজিয়ে রাখেন তাঁরা। পরে মঙ্গলবারের সাপ্তাহিক হাটে পাইকারদের কাছে বিক্রি করেন। এ ছাড়া প্রতিদিনই এ বাজারে পান কেনাবেচা হয়।

হাইমচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাকিল খন্দকার বলেন, উপজেলায় ২৩৫ হেক্টর জমিতে ২৭২টি পানের বরজ রয়েছে। এ আবাদে প্রায় ছয় হাজার কৃষক জড়িত। প্রতিবছর কমপক্ষে ৫০ থেকে ৫২ কোটি টাকার পান বিক্রি হয়। পান উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে কৃষকদের নিয়মিত কারিগরি পরামর্শ ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে এ খাতে বরাদ্দ না থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনা সম্ভব হচ্ছে না।

শেয়ার করুন: