শাহরাস্তি পৌরসভায় ময়লার ভাগাড়, দুর্গন্ধ ও স্বাস্থ্যঝুঁকিতে জনজীবন

 

 

মো. মহিউদ্দীন :

চাঁদপুরের শাহরাস্তি পৌরসভার বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে ছোট – বড় অসংখ্য ময়লার ভাগাড়। প্রধান সড়ক, অলিগলি, বাজার এলাকা, খালের পাড় ও পুকুরপাড়জুড়ে জমে থাকা আবর্জনার স্তূপ থেকে ছড়াচ্ছে তীব্র দুর্গন্ধ। এতে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েছেন পৌরবাসী। তবে এসব বর্জ্য অপসারণ ও কার্যকর ব্যবস্থাপনায় পৌর কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে উদাসীনতার অভিযোগ স্থানীয়দের।

সরেজমিনে দেখা যায়, পৌরসভার প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ১, ২, ৩, ৭ ও ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্যের স্তূপ জমে রয়েছে। বাজার এলাকার পাশে পচা খাবার, প্লাস্টিক, নষ্ট সবজি, ফলমূল ও পশুর বর্জ্য ফেলে রাখা হচ্ছে। এসব বর্জ্য দিনের পর দিন পড়ে থাকায় সেগুলো পচে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে এবং রোগজীবাণুর বিস্তারের আশঙ্কা বাড়ছে।

পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী মেহের কালীবাড়ি বাজারে উপজেলার প্রধান সড়কের পাশে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুলের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায় গড়ে উঠেছে বড় ধরনের ময়লার ভাগাড়। সেখানে বাসাবাড়ি, হোটেল ও রেস্তোরাঁর বর্জ্য স্তূপাকারে জমে থাকতে দেখা যায়। পথচারী ও বাজারে আসা ক্রেতা – বিক্রেতাদের এ দুর্গন্ধের মধ্যেই চলাচল করতে হচ্ছে।

৮ নম্বর ওয়ার্ডে উপজেলা পরিষদ কমপ্লেক্স সংলগ্ন দারুল কুরআন হাফেজিয়া মাদ্রাসার কয়েক গজ দক্ষিণে বৈদ্য বাড়ির পুকুরপাড়ে প্রধান সড়কের উভয় পাশে বর্জ্যের স্তূপ তৈরি হয়েছে। একইভাবে নিজমেহের মডেল পাইলট উচ্চ বিদ্যালয়ের দক্ষিণ পাশে কালীবাড়ি-লোটরা সড়কের ধারে বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে আরও একটি ভাগাড় গড়ে উঠছে। দক্ষিণ কালীবাড়ির ঋষি বাড়ি সংলগ্ন ডোবার পাড় এবং কালীবাড়ি মাঠের দক্ষিণ পাশে গণশৌচাগারের কাছেও রয়েছে বড় বড় আবর্জনার স্তূপ।

এদিকে ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ঠাকুর বাজারে অবস্থিত ঠাকুর বাজার দিঘির উত্তর পাড়ে গরুর বাজার স্থাপনের লক্ষ্যে পৌর কর্তৃপক্ষ ভূমি ক্রয় করেছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, ওই স্থান ভরাটের উদ্দেশ্যে পৌরসভার বিভিন্ন এলাকা থেকে ময়লা – আবর্জনা এনে দিঘিতে ফেলা হচ্ছে। ফলে পঁচা দুর্গন্ধে আশপাশের পরিবেশ দূষিত হয়ে উঠেছে। পাশাপাশি জলাশয়ের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যও হুমকির মুখে পড়েছে বলে মনে করছেন সচেতন নাগরিকরা।

১ নম্বর ওয়ার্ডে ঠাকুর বাজার-শাহরাস্তি বাজার সড়কের দক্ষিণ পাশে মেহের গোদাখালের পাড়ে রয়েছে আরেকটি বড় ভাগাড়। ২ নম্বর ওয়ার্ডের মেহের রেলওয়ে স্টেশন বাজার ও দোয়াভাঙ্গা বাসস্ট্যান্ড বাজার এলাকায়ও সড়কের পাশে ও খালের পাড়ে যত্রতত্র আবর্জনা পড়ে থাকতে দেখা যায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব এলাকায় পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়েছে।

৩ নম্বর ওয়ার্ডে একটি ডাস্টবিন থাকলেও উৎপাদিত বর্জ্যের তুলনায় সেটি অত্যন্ত ছোট। ফলে স্থানীয় বাসিন্দা ও বাজারের পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা বাধ্য হয়ে কুমিল্লা-চাঁদপুর আঞ্চলিক সড়কের পাশের খালে বর্জ্য ফেলছেন। এতে খালের স্বাভাবিক পানি প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, এসব ময়লার স্তূপ থেকে সারাক্ষণ দুর্গন্ধ ছড়ায়। বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি ডায়রিয়া, জ্বর, শ্বাসকষ্ট ও বিভিন্ন চর্মরোগের ঝুঁকিও বাড়ছে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্করা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

তাদের প্রশ্ন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসকসহ বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তারা প্রতিদিন এসব স্থানের পাশ দিয়ে যাতায়াত করলেও বিষয়টি কেন কার্যকরভাবে নজরে আসছে না। দীর্ঘদিন ধরে সমস্যার সমাধান না হওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ বাড়ছে।

পৌরবাসীর দাবি, দ্রুত সময়ের মধ্যে অবৈধ ও অনিয়ন্ত্রিত ময়লার ভাগাড় অপসারণ করে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র স্থাপন করতে হবে। পাশাপাশি নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা, সচেতনতামূলক প্রচার চালানো এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ নিতে হবে।

উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা আকলিমা জাহান তানিয়া ইনকিলাবকে জানান, অপরিকল্পিতভাবে ময়লা – আবর্জনা ফেলে রাখলে মশা-মাছির বংশবিস্তার বৃদ্ধি পায়। এতে ডায়রিয়া, টাইফয়েড, চর্মরোগসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ে। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত বর্জ্য অপসারণ এবং পরিচ্ছন্ন পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।

এ বিষয়ে পৌর সভার ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সৈয়দ মশিউর রহমান জানান, পৌর এলাকার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নে আমরা কাজ করছি। যেসব স্থানে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ময়লা ফেলা হচ্ছে, সেগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত স্থানে বর্জ্য অপসারণ ও পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম জোরদার করার লক্ষ্যে প্রতিবেদকের সম্মুখেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে মুঠোফোনে নির্দেশ দেন।

সহকারী প্রকৌশলী মো.নোমান হোসেন জানান, ডাম্পিং স্টেশনের জন্য পৌর কর্তৃপক্ষ জায়গা কিনলেও সরকারি বরাদ্দ না পাওয়ায় এখনো পর্যন্ত ডাম্পিং স্টেশনের কোন অগ্রগতি নেই। তবে কতৃপক্ষ চেষ্টা তদবির অব্যাহত রেখেছে।

তবে পৌরবাসির প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে শাহরাস্তি পৌরসভাকে একটি পরিচ্ছন্ন, স্বাস্থ্যসম্মত ও বাসযোগ্য নগরীতে পরিণত করতে হবে।

 

Loading

শেয়ার করুন: