নিজস্ব প্রতিবেদক :
চাঁদপুর জেলার সার্বিক উন্নয়ন, আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বিষয়ক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ১৫সেপ্টেম্বর (বুধবার) বেলা সাড়ে ১১টায় চাঁদপুর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন চাঁদপুর জেলার সার্বিক তদারকিপ্রাপ্ত ও জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান এমপি।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে জাতীয় সংসদের হুইপ এ বি এম আশরাফ উদ্দিন নিজান বলেন, মানুষের আঙ্খাকার মূল্য দিতে হবে। আপনারা সবাই এখানে জ্ঞানী গুনি মানুষ। সমাজে অন্যায় বেশি হচ্ছে। শিক্ষিত ও ধনী লোকদের মাধ্যমে। আমাদের পূর্ব পুরুষরা ভালো কিছু শুরু করেছেন, কিন্তু আমরা তা শেষ করে দিচ্ছি। মানুষের স্বার্থে আইন প্রয়োগ করতে হবে। আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন করতে হবে। ১জন মানুষ ১মিনিট রাস্তায় অপেক্ষা করতে রাজি না৷ আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ প্রথা ভাঙ্গতে চান। তিনি কখনও কোন বিষয়ে বিরক্ত হন না। আমাদের চিন্তায় সততা থাকতে হবে। অনেক জেলে, আমরা ভয় পাচ্ছিনা কেন। আমাদের মনোজগৎকে চেঞ্জ করতে হবে৷ সমাজে ভালো কাজ করতে বেশি দিন বেচে থাকতে হয় না৷ আপনারা সাহায্য করলে নতুন বাংলাদেশের আঙ্খাকা পূরনের স্টেক হোল্ডার হবেন৷ যে যেই ধর্মের মানুষ হন, ধর্ম সঠিক ভাবে পালন করতে হবে। দেশের উন্নয়নে আপনাদের সাহায্য চাই। মাদকসেবীদের একসঙ্গে রাখা যাবে না। তাদের আলাদাভাবে রাখতে হবে। মাদকের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তিনি বলেন, চাঁদপুর ইলিশের প্রধান প্রজনন কেন্দ্র। সারা পৃথিবী চাঁদপুরকে ইলিশের জন্য চেনে ও জানে। তাই ইলিশ রক্ষায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।
কোস্টগার্ডের কার্যক্রম প্রসঙ্গে হুইপ বলেন, মালামাল জব্দ করে মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে, কিন্তু কোনো মামলা বা কাউকে আটক করা হয়নি এটা কেন হবে? জব্দ করা মালামালের ঘটনায় আইন অনুযায়ী মামলা করতে হবে এবং জড়িতদের আটক করার নির্দেশ দেন তিনি।
চাঁদপুরের শিক্ষা ব্যবস্থার বিষয়ে তিনি প্রশ্ন তুলে বলেন, জেলার আটটি উপজেলায় মাত্র দুইজন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার দিয়ে কীভাবে কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে? এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি। উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স গুলোকে ৫০ শয্যা থেকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার যে প্রজ্ঞাপন হয়েছিল, সেটি পরিবর্তন করে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পাসপোর্ট অফিসে মানুষের ভোগান্তির বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বলেন, পাসপোর্ট সেবা নিতে গিয়ে মানুষ যেন হয়রানির শিকার না হয়। কর্মকর্তাদের যোগসাজশে দালালদের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে ভোগান্তিতে ফেলার অভিযোগ খতিয়ে দেখতে হবে। বিদেশগামীদের তিন দিনের প্রশিক্ষণ নিয়েও যেন অযথা ভোগান্তি না হয়, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
হুইপ বলেন, এটা তারেক রহমানের সরকার। সরকারের নীতিমালার বাইরে আমরা কিছু করতে পারব না। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী সবাইকে দায়িত্ব পালন করতে হবে।
সভায় বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধানরা নিজেরা উপস্থিত না হয়ে প্রতিনিধি পাঠানোয় ক্ষোভ প্রকাশ করেন হুইপ এ বি এম আশ্রাফ উদ্দিন নিজান। গুরুত্বপূর্ণ জেলা পর্যায়ের সভায় সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধানদের সরাসরি উপস্থিত থেকে নিজেদের কার্যক্রম ও সমস্যাগুলো তুলে ধরার নির্দেশ দেন তিনি।
চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক বলেন, নিষিদ্ধ সংগঠনে তৎপরতা বেড়েছে। নিষিদ্ধ সংগঠনে অফিস আছে তা ভূমি অফিসের সরকারি জায়গায়। সেই ভবনে মাদকাসক্তদের আস্তানা হয়ে উঠেছে। নিষিদ্ধ সংগঠনের লোকদের ধরার জন্য পুলিশ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে তারা নিষিদ্ধ কার্যক্রম পরিচালনা করার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, সাব-রেজিস্টার অফিস এখনো পূরণো ধারায় চলছে। সরকারের নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করতে হবে। সকল ক্ষেত্রেই আইন মেনে চলতে হবে। এত বছর যে ভাবে চলেছে, এখন আর সেভাবে চলা যাবে না। নতুন বাস্তবতায় সবাইকে আইন ও নিয়মের মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। ভূমি অফিস, ইউপি সচিব এগুলো দূর্ণীতির ভরপুত্র। এগুলো পরিবর্তন করতে হলে, সে সকল কর্মকর্তাদের পরিবর্তন করতে হবে। এখানে প্রশাসনের কিছু ভূমিকা আছে।
তিনি বলেন, চাঁদপুর সদর হাসপাতাল ৫০০ শয্যায় উন্নতি করা দরকার। হাসপাতালটি ৫০০ শয্যা করা খুবই জরুরি। চাঁদপুরের সকল নাগরিক কৃতজ্ঞ থাকবে। রোগী মারা যাওয়ার পর সমাজসেবার বরাদ্দ দিয়ে লাভ কী? আবেদন ও যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া দ্রুত করতে হবে, যাতে প্রকৃত সুবিধা ভোগীরা সময়মতো সরকারি সহায়তা পান।
চাঁদপুর-৫ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মমিনুল হক বলেন, জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপার আমাদের না জানিয়ে আমাদের নির্বাচনী এলাকায় কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমরা কষ্ট পাই। জনপ্রতিনিধিদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।
তিনি বলেন, খুনের মামলার আসামিরা জেলা প্রশাসক বা পুলিশ সুপারের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন, এটি অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয়। জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনগণের প্রতি অনেক দায়িত্ব রয়েছে। প্রশাসনের কোনো আচরণে যেন এমনটা প্রকাশ না পায় যেন তারা বিশেষ কোনো দলের নিয়োগপ্রাপ্ত।
ভূমি অফিসের কার্যক্রম নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ভূমি অফিস এখনো পুরোনো কায়দায় চলছে। আমরা সকল সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তাদের কাছ থেকে আন্তরিকতা চাই। জনগণের প্রত্যাশা পূরণে জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।
চাঁদপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য এম এ হান্নান বলেন, কোন উপজেলায় কোন দপ্তরের কী কী কাজ হচ্ছে বা হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সভায় উপস্থাপন করলে সবাই জেলার উন্নয়ন কার্যক্রম সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পাবে।
তিনি বলেন, জনগণ আমাকে ভোট দিয়ে সংসদ সদস্য বানিয়েছে। জনগণের কাজ করার জন্যই আমি এসেছি। বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে জেলার উন্নয়ন ও জনগণের স্বার্থে কাজ করছি। আমি আর কখনো নির্বাচন করব না। আমি যদি বেচে থাকি জীবনে আর নির্বাচন করব না। সামনে নির্বাচন আমরা একসাথে কাজ করবো।
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য আলহাজ্ব রাশেদা বেগম হীরা বলেন, মাদক মামলায় আটক ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অন্তত ছয় মাস কারাগারে রাখতে হবে। তারা যেন সহজে জামিন না পায়, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের নজর দিতে হবে। কারণ মাদক ব্যবসায়ী বা সেবীরা আটকের পরদিনই জামিনে বের হয়ে এসে মাদকের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া ব্যক্তিদের হুমকি-ধামকি ও হামলা করছে। এতে মাদকের বিরুদ্ধে কাজ করতে আগ্রহী মানুষ নিরুৎসাহিত হচ্ছে।
চাঁদপুর জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমানের সভাপতিত্বে সভায় কার্যবিবরণী পাঠ করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. এরশাদ উদ্দিন ও অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রট উজালা রানী চাকমা।
সভায় আরো বক্তব্য রাখেন, চাঁদপুর পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, চাঁদপুর নৌ পুলিশের পুলিশ সুপার সৈয়দ মুশফিকুর রহমান, চাঁদপুর জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাড. সলিম উল্যা সেলিম, চাঁদপুর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক রোটারিয়ান মাহবুবুর রহমান, চাঁদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী, চাঁদপুর জেল সুপার মো. জয়নাল, চাঁদপুর মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. মিজানুর রহমান, চাঁদপুরের পিপি অ্যাড. কোহিনূর বেগম, চাঁদপুর গণপূর্ত বিভাগের নাসিম আহমেদ টিটো, চাঁদপুর সড়ক ও জনপথের উপ বিভাগীয় প্রকৌশলী শাহীনুর রহমান, চাঁদপুর শিক্ষা বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মুজাহিদুল ইসলাম আলিফ, চাঁদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের উপ নির্বাহী প্রকৌশলী মোস্তাফিজুর রহমান, চাঁদপুর মেঘনা ধনাগোদা সেচ প্রকল্পের উপ নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সালাহ উদ্দিন, চাঁদপুর স্থানীয় সরকার বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুজ্জামান, চাঁদপুর জনস্বাস্থ্য নির্বাহী প্রকৌশলী আবু মুসা মো. ফয়সাল, চাঁদপুর স্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সহকারী প্রকৌশলী মাবরুর ইসলাম চৌধুরী, চাঁদপুর কৃষি সম্প্রসারন বিভাগের উপ-সহকারী প্রকৌশলী আবু তাহের, চাঁদপুর বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মেহেদী হাসান ভূঁইয়া, চাঁদপুর সমাজ সেবা অফিসের উপ পরিচালক মো. নজরুল ইসলাম, চাঁদপুর জেলা শিক্ষা অফিসার মোহাম্মদ রুহুল্লাহ, চাঁদপুর জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) মোসাদ্দেক হোসেন, চাঁদপুর সিভিল সার্জন প্রতিনিধি ডা. মো. রফিকুল হাসান ফয়সাল চাঁদপুর, জেলা কালচারাল অফিসার দিপ্তি সাহা, চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-১ ডিজিএম মো. নিজাম উদ্দিন শামস, চাঁদপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি-২ এজিএম এ এফ এম রাকিবুল হক, চাঁদপুর মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর উপ পরিচালক নাছিমা আক্তার, চাঁদপুর প্রবাসী কল্যাণ সহকারী পরিচালক মো. সফিকুর রহমান, চাঁদপুর বিআরটিএ সহকারী পরিচালক (প্রকৌশল) আব্দুল আল মামুন সহ বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রধান, প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।