নিজস্ব প্রতিনিধি :
পাহাড়, মেঘ আর ঝরনার মিতালীতে মুখর পার্বত্য জেলা বান্দরবানে অত্যন্ত আনন্দঘন পরিবেশে সম্পন্ন হলো চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির তিন দিনব্যাপী বার্ষিক পারিবারিক ভ্রমণ। গত ২৯শে অক্টোবর রাতে চাঁদপুর থেকে যাত্রা শুরু করে ১লা নভেম্বর চাঁদপুরে প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে এই নান্দনিক ভ্রমণের সমাপ্তি ঘটে। সাহিত্য ও সংস্কৃতির মেলবন্ধনে আয়োজিত এই কাফেলায় চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির স্থায়ী কমিটি, সদস্যবৃন্দ এবং তাঁদের পরিবারবর্গ অংশ নেন।
নেতৃত্বে ও ব্যবস্থাপনায় যাঁরা ছিলেন: চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির মহাপরিচালক কাদের পলাশের সার্বিক দিকনির্দেশনায় এই ভ্রমণটি সফলভাবে সম্পন্ন হয়। ভ্রমণ উপ-কমিটির আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম মানিক এবং সদস্য সচিব জাহিদ হাসান নয়ন পুরো আয়োজনের মূল দায়িত্বে ছিলেন। এছাড়াও ভ্রমণ উপ-কমিটির সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহীল কাফী, ভ্রমণ সমন্বয়ক আবু হানিফ ও আরিফুল ইসলাম শান্ত নিখুঁত সমন্বয়ের মাধ্যমে পুরো ভ্রমণটি পরিচালনা করেন। ভ্রমণের আনন্দঘন মুহূর্তগুলোতে চমৎকার সংস্কৃতি উপস্থাপনার দায়িত্বে ছিলেন কাজী রাসেল।
ভ্রমণ সমাপনীতে গুণীজনদের অনুভূতি ও বক্তব্য: ভ্রমণের শেষ দিনে হোটেল হিল ভিউ-এর মিলনায়তনে এক সংক্ষিপ্ত সমাপনী ও সাহিত্য আড্ডা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে সংগঠনের শীর্ষ নেতৃত্ব ও আয়োজক কমিটির দায়িত্বশীলরা তাঁদের অনুভূতি প্রকাশ করেন মহাপরিচালক কাদের পলাশ (বিদায়ী বক্তব্য):প্রকৃতির সান্নিধ্য মানুষের চিন্তাশক্তিকে প্রসারিত করে এবং সৃজনশীলতাকে শাণিত করে। পাহাড় ও ঝরনার এই অপরূপ সৌন্দর্য আমাদের লেখকদের নতুন সাহিত্য সৃষ্টির অনুপ্রেরণা জোগাবে। অত্যন্ত চমৎকার ও সুশৃঙ্খলভাবে এই পারিবারিক আবহ তৈরি করার জন্য আমি আয়োজক কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাই। সাহিত্য একাডেমির এই ঐক্য ও সৌহার্দ্য আগামী দিনেও অক্ষুণ্ন থাকবে।
ভ্রমণ উপ-কমিটির আহ্বায়ক মাইনুল ইসলাম মানিক: চাঁদপুর সাহিত্য একাডেমির সকল সদস্য ও তাঁদের পরিবারকে সাথে নিয়ে একটি সুন্দর ও নিরাপদ ভ্রমণ উপহার দেওয়া আমাদের মূল লক্ষ্য ছিল। সকলের আন্তরিক সহযোগিতা ও স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণের কারণেই পাহাড়ি আঁকাবাঁকা পথেও আমরা প্রতিটি স্পট সফলভাবে ঘুরে দেখতে পেরেছি।
ভ্রমনে সাহিত্য একাডেমির পরিচালক ফরিদ হাসান বলেন, আমাদের বেশিরভাগ সদস্য বান্দরবান ভ্রমনে প্রথম এসেছেন। সকলের এই আনন্দ স্মৃতিময় হয়ে থাকবে।
ভ্রমণ উপ-কমিটির সদস্য সচিব জাহিদ হাসান নয়ন: তিনটি দিন কীভাবে আনন্দের মধ্য দিয়ে কেটে গেল বুঝতেই পারিনি। হোটেল আবাসন থেকে শুরু করে যাতায়াত ও খাবারের প্রতিটি বিষয়ে আমরা সর্বোচ্চ নিখুঁত রাখার চেষ্টা করেছি। এই ভ্রমণ আমাদের সাংগঠনিক বন্ধনকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
সহ-সভাপতি আব্দুল্লাহীল কাফী ও সমন্বয়ক আবু হানিফ: বান্দরবানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য দেখার পাশাপাশি স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী ‘ব্যাম্বো চিকেন’-এর স্বাদ নেওয়া এবং চাঁদের গাড়ির রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা সত্যিই দারুণ ছিল। সাহিত্য আড্ডা ও ভ্রমণের এই চমৎকার মেলবন্ধন আমাদের স্মৃতিতে চিরকাল অমলিন থাকবে।
হলুদ উৎসবে বর্ণিল সূচনা ও আবাসন: ভ্রমণকে স্মরণীয় করে রাখতে অংশগ্রহণকারীরা লোগো সম্বলিত আকর্ষণীয় হলুদ কলার-যুক্ত টি-শার্ট পরিধান করে পুরো বান্দরবানে এক চমৎকার ‘হলুদ উৎসবে’ মেতে ওঠেন। বান্দরবান শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সুদৃশ্য আবাসিক হোটেল ‘হিল ভিউ’-এ সাহিত্যিকদের এই দলের আবাসন নিশ্চিত করা হয়। পাহাড়ি আঁকাবাঁকা ও উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিতে সদস্যরা স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী হুডখোলা ‘চাঁদের গাড়ি’ ব্যবহার করেন, যা ভ্রমণে বাড়তি রোমাঞ্চ যোগ করে।
পাহাড়, মেঘ ও নয়নাভিরাম ঝরনার রাজ্যে বিচরণ: তিন দিনের এই ট্যুরে সংগঠনের সদস্যরা বান্দরবানের সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখেন। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় দুই হাজার ফুট উঁচুতে অবস্থিত বিখ্যাত ‘নীলগিরি হিল রিসোর্ট’-এ মেঘ ও পাহাড়ের অপূর্ব মিতালী উপভোগ করেন তাঁরা। সেখানে পাহাড়ি সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী জুম চাষের রঙ-বেরঙের ম্যুরালের সামনে এবং লেখা বিশেষ ফটোফ্রেমে দাঁড়িয়ে স্মৃতিময় ছবি তোলেন সকলে। এছাড়া ‘নীলাচল’ পর্যটন কেন্দ্রে দাঁড়িয়ে পুরো বান্দরবান শহরের প্যানোরামিক ভিউ এবং পাহাড়ের দিগন্ত বিস্তৃত সৌন্দর্য দেখে মুগ্ধ হন অংশগ্রহণকারীরা।
পাহাড়ের পাশাপাশি বান্দরবানের নয়নাভিরাম ঝরনা ও জলধারা দেখা ছিল এই ভ্রমণের অন্যতম সেরা আকর্ষণ। সদস্যরা বিখ্যাত ‘শৈলপ্রপাত’ ঝরনার পাথুরে ঢাল ও কলকল করে বয়ে চলা হিমশীতল পানির তীব্র স্রোতের কাছে গিয়ে দারুণ সময় কাটান। এছাড়াও তাঁরা ঘুরে দেখেন ‘মেঘলা পর্যটন কমপ্লেক্স’। সেখানকার সবুজ লেকের ওপর নির্মিত রোমাঞ্চকর কাঠের ঝুলন্ত সেতুতে হাঁটার অভিজ্ঞতা এবং প্রস্থান পথে “ধন্যবাদ আবার আসবেন” লেখা তোরণটি ভ্রমণকারীদের মন ছুঁয়ে যায়।
পাহাড়ের কোল ঘেঁষে বয়ে চলা সাঙ্গু নদীর ব্রিজে দাঁড়িয়ে প্রকৃতির রূপ আস্বাদন এবং আধ্যাত্মিক ও নান্দনিক স্থাপত্যের প্রতীক ‘স্বর্ণ মন্দির’ (বুদ্ধ ধাতু জাদি)-এর বিশাল সোনালী বুদ্ধ মূর্তি দর্শন ভ্রমণসূচিতে ভিন্ন মাত্রা যোগ করে।